শহীদ শরীফ উসমান বিন হাদি : জ্যোতির্ময় এক ধূমকেতু
প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক পরিচয়:
শরীফ উসমান বিন হাদির জন্ম ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন, বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়। তার পরিবার ছিল ধর্মীয়, শিক্ষাবান্ধব ও নৈতিক মূল্যবোধে দৃঢ়। পিতা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক এবং মাতা তসলিমা হাদি ছিলেন একজন সচেতন গৃহিণী। পরিবার থেকেই তিনি ন্যায়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন চিন্তার শিক্ষা লাভ করেন।
শৈশবকাল থেকেই তিনি ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর আগ্রহী ছিলেন। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়।
শিক্ষাজীবন ও একাডেমিক ভিত্তি:
শহীদ শরীফ উসমান বিন হাদি প্রাথমিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাধারায় অধ্যয়ন করেন এবং পরে সাধারণ শিক্ষায় অগ্রসর হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন (২০১৬-২০১৯)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি গবেষণা, রাজনৈতিক পাঠচক্র, সেমিনার এবং নীতিনির্ধারণমূলক আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখান থেকেই তিনি "একাডেমিক অ্যাক্টিভিস্ট" হিসেবে পরিচিত হন — যেখানে পাঠদান, গবেষণা ও রাজনৈতিক সচেতনতা একত্রে পরিচালিত হতো।
রাজনৈতিক দর্শন ও সামাজিক কার্যক্রম:
শরীফ উসমান বিন হাদির রাজনৈতিক দর্শন এর মূল ভিত্তি ছিল—— •গণতন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগ •রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব •অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা •বিদেশি আধিপত্য ও নির্ভরশীলতার বিরোধিতা।
২০২৩ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন নাগরিক মঞ্চ, শিক্ষাঙ্গন ও অনলাইন প্লাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে বক্তৃতা ও লেখালেখির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দূর্বলতা ও বিদেশি প্রভাবের সমালোচনা করেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার যে গণআন্দোলন শুরু হয়, সেখানে তিনি অন্যতম প্রধান সংগঠক ও চিন্তায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার ভাষণ ও বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে ——বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় প্রভাবের সমালোচনা।
ইনকিলাব মঞ্চ: প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম
২০২৪ সালের ১৩ আগষ্ট ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। শরীফ উসমান বিন হাদি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও মুখপাত্র।
ইনকিলাব মঞ্চের মূল উদ্দেশ্য ছিল———
• বিকল্প ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা
• ছাত্র–যুব সমাজকে সংগঠিত করা
• জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা
• বিদেশি আধিপত্য ও অসম চুক্তির বিরোধিতা
এই প্লাটফর্ম থেকে তিনি সীমান্ত হত্যা, পানি বন্টন, বানিজ্য বৈষম্য এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত কেন্দ্রিক নির্ভরতার কঠোর সমালোচনা করেন। ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ও বক্তব্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও ধারাবাহিক।
সাহিত্যকর্ম ও লেখালেখি:
শরীফ উসমান বিন হাদি রাজনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তামূলক লেখালেখির পাশাপাশি কবিতার মাধ্যমেও তার প্রতিবাদী চেতনা ও মানবিক বোধ প্রকাশ করেছেন। তার সাহিত্যকর্মে জাতীয় স্বাধীনতা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তরুণদের স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক গ্রন্থ:
রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিক — ২০১৯
তারুণ্য ও ইনকিলাব — ২০২১
জুলাই গণ আন্দোলন: অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ —২০২৪
গণতন্ত্র কেন ব্যর্থ হয় —২০২৫
কবিতা গ্রন্থ:
আগুনের অক্ষর —২০১৮
প্রতিবাদের দিনলিপি —২০২০
দ্রোহ ও স্বপ্নের কবিতা —২০২২
স্বাধীনতার খোঁজে —২০২৪
তার বিখ্যাত ও বহুল আলোচিত ও সমাদৃত কবিতা "আমাকে ছিঁড়ে খাও হে শকুন" প্রতিবাদের দিনলিপি(২০২০) গ্রন্থের অন্তর্গত।
এই কবিতায় কবি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ ও প্রতিবাদের চরম ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।
তার কবিতা গ্রন্থগুলোতে রাষ্ট্রীয় অবিচার, বিদেশি আধিপত্য, তরুণ সমাজের হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সাহিত্যপত্র, অনলাইন ম্যাগাজিন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ ও কলাম লিখতেন, যেখানে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সমালোচনা একটি প্রধান বিষয় ছিল।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান:
শরীফ উসমান বিন হাদি মনে করতেন ——— বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল ভৌগলিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও জরুরি। তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, প্রতিবেশী শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।
তিনি তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, বিদ্যুৎ ও বন্দর চুক্তি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে অসম সম্পর্কের সমালোচনা করেন। তার এই অবস্থান তাকে তরুনদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্র ও প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন করে তোলে।
হামলার কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
বিশ্লেষকদের মতে, শরীফ উসমান বিন হাদির ওপর হামলার প্রধান কারণ ছিল———
•ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তার স্পষ্ট ও প্রকাশ্য অবস্থান
•ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে উত্থান
•প্রচলিত রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় জুম'আর নামায শেষে তার উপর পরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এই হামলাকে অনেকেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
মৃত্যু ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া:
আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকায় (এভার কেয়ার হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হলে বিদেশে(সিঙ্গাপুর) স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর শরীফ উসমান বিন হাদি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৩২ বছর।
তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সংলগ্নে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়। তার জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়।
তার মৃত্যু দেশজুড়ে প্রতিবাদ, শোক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন তাকে 'গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ' হিসেবে ঘোষণা করে।
** আরও পড়ুন
তার মৃত্যু দেশজুড়ে প্রতিবাদ, শোক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন তাকে 'গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ' হিসেবে ঘোষণা করে।
** আরও পড়ুন

No comments