সত্যজিৎ রায়---বাংলা সংস্কৃতির চিরসবুজ নক্ষত্র

সত্যজিৎ রায় বাংলা সংস্কৃতি ও বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য, অতুলনীয় এবং চিরস্মরণীয় নাম। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, সংগীত পরিচালক, চিত্রকর ও চিন্তাবিদ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মানবজীবনের বাস্তবতা, সমাজের জটিলতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাকে তিনি শিল্পের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছেন।

প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক পটভূমি :

সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালের ২ মে, ভারতের পশ্চিবঙ্গের কলকাতা শহরে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক বিশিষ্ট সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় সম্বৃদ্ধ পরিবারে। তাঁর পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য রম্যলেখক, কবি ও শিশুসাহিত্যিক। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন খ্যাতিমান লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিত্ব। তার মায়ের নাম ছিল সুপ্রভা রায়।
মাত্র তিন বছর বয়সে, ১৯২৩ সালে পিতা সুকুমার রায়ের মৃত্যু হয়। এরপর মায়ের স্নেহ ও তত্বাবধানেই সত্যজিৎ রায়ের শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বই পড়া, আঁকাআঁকি, পাশ্চাত্য সঙ্গীত, ধ্রপদী সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। পারিবারিক পরিবেশই তাঁর শিল্পীসত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষাজীবন

সত্যজিৎ রায় কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন(১৯৪০)। মায়ের ইচ্ছানুযায়ী তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন এবং চারুকলায় শিক্ষা লাভ করেন (১৯৪০-১৯৪২)।
শান্তিনিকেতন এর মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির সান্নিধ্য ও শিল্পচর্চা তাঁর চিন্তাভাবনা ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এখানেই তিনি ভারতীয় শিল্প, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আরও গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে ওঠেন।

কর্মজীবনের সূচনা

শিক্ষা সমাপ্তির পর সত্যজিৎ রায় কলকাতায় ফিরে এসে 'ডি.জে.কিমার' নামক একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় গ্রাফিক ডিজাইনার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এই সম্য তিনি বইয়ের প্রচ্ছদ নকশা, টাইপোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল ডিজাইনে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি 'সিগনেট প্রেস' এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস 'পথের পাঁচালি'-এর প্রচ্ছদ নকশা করেন। এই উপন্যাসই পরবর্তীতে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেরণা হয়ে ওঠে।

চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা ও সাফল্য

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা হয় ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'পথের পাঁচালি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সীমিত বাজেট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী বিপুল প্রশংসা অর্জন করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে 'Best Human Document' পুরস্কার লাভ করে।

এরপর তিনি নির্মাণ করেন—
অপরাজিত (১৯৫৬) এবং অপুর সংসার (১৯৫৯)
"পথের পাঁচালি, অপরাজিত ও অপুর সংসার" এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একসাথে 'অপু ট্রিলজি' নামে পরিচিত।

তার আরোও কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ হলো——
জলসাঘর(১৯৫৮), দেবী(১৯৬০), কাঞ্চনজঙ্ঘা(১৯৬২), চারুলতা(১৯৬৪), নায়ক (১৯৬৬), গুপী গাইন বাঘা বাইন(১৯৬৯), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), অশনি সংকেত (১৯৭৩), শতরঞ্জ কা খিলাড়ি (১৯৭৭), ঘরে বাইরে(১৯৮৪)

এই চলচ্চিত্রগুলোতে মানবিক অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও নান্দনিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।

সাহিত্যকর্ম

চচলচ্চিত্রের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে কিশোর ও শিশু সাহিত্যে অনন্য অবদান রাখেন।

ফেলুদা সিরিজ (গোয়েন্দা সাহিত্য)
ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি(১৯৬৫), বাদশাহী আংটি(১৯৬৬), জয় বাবা ফেলুনাথ(১৯৭০), সোনার কেল্লা(১৯৭১)

প্রফেসর শঙ্কু সিরিজ (বিজ্ঞান কল্পকাহিনী)
ব্যেমযাত্রীর ডায়রি—১৯৬১, প্রফেসর শঙ্কু সমগ্র—১৯৭৪ তারিণীখুড়োর গল্প
গল্পসল্প(১৯৮৫)

প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা
Our Films,Their Films— ১৯৭৬ বাংলা সিনেমার কথা—১৯৭৬

সম্মাননা ও পুরস্কার

সত্যজিৎ রায় তার চলচ্চিত্রে অবদান স্বরূপ যে সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
পপদ্মভূষণ —১৯৬৫
পদ্মবিভূষণ —১৯৭৬
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার —১৯৮৫
লিজিওন দ্য অনার —১৯৮৭( ফ্রান্স সরকার)
একাডেমি অনারারি অস্কার (Lifetime Achievement Award)—১৯৯২
১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সস তাকে আজীবন সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করে। গুরুতর অসুস্থতার কারণে তিনি লস এঞ্জেলেসে উপস্থিত থাকতে পারেননি; কলকাতা থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সম্মান গ্রহন করেন। এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায়।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষ দিকে সত্যজিৎ রায় হৃদরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তবুও তিনি সৃষ্টিশীল কাজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেননি।

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭০ বছর। তার মৃত্যুতে বাংলা ও বিশ্বচলচ্চিত্র এক মহান শিল্পীকে হারায়।

**আরও জানতে

No comments

Powered by Blogger.