কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন, সাহিত্যকর্ম, সম্মাননা এবং মৃত্যু
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে (১১ জৈষ্ঠ্য ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। পিতা ছিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম ও খাদেম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় শৈশব থেকেই নজরুলকে সংগ্রামমুখর জীবনযাপন করতে হয়। পিতার মৃত্যুর পরে সংসারের হাল ধরতে তাঁকে অল্প বয়সেই বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে হয়। কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ, কখনো লেটোর দলে গান লেখা ও অভিনয় -- এসবের মধ্য দিয়েই তার জীবনের প্রাথমিক অধ্যায় গড়ে ওঠে।
নজরুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোইনি। তিনি কিছু দিন মক্তব ও স্কুলে পড়াশোনা করলেও আর্থিক সমস্যার কারনে নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তবে তার প্রকৃত শিক্ষা ছিল জীবন, সংগ্রাম ও বহুমুখী সাহিত্যপাঠ থেকে অর্জিত।
কর্মজীবনে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং করাচীতে কর্মরত অবস্থায় সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে যুক্ত হন।সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি সাহিত্যচর্চাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। তিনি "ধুমকেতু","নবযুগ"সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন।
১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা "বিদ্রোহী" প্রকাশিত হলে তিনি বাংলা সাহিত্য জগতে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি পরাধীনতা, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে প্রতিবাদ জানান এবং 'বিদ্রোহী' কবি হিসেবে পরিচিত হন। এই কবিতার জন্য "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর" তাকে শুভেচ্ছাজ্ঞাপন করেন।
কাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলো হলো:
কবিতা গ্রন্থ : অগ্নিবীণা -১৯২২, বিষের বাঁশি -১৯২৪, ভাঙার গান-১৯২৪, সাম্যবাদী-১৯২৬, সর্বহারা -১৯২৬, সন্ধ্যা -১৯২৯, চক্রবাক -১৯২৯
গীতিকাব্য ও গান: দোলনচাঁপা -১৯২৩, বুলবুল-১৯২৮, ঝিঙেফুল -১৯৩১
তিনি প্রায় চার হাজারের বেশি গান রচনা ও সুরারোপ করেন, যা 'নজরুলগীতি' নামে পরিচিত। এসব গানে প্রেম, বিদ্রোহ, ভক্তি, দেশপ্রেম ও মানবতার সুর মিলেমিশে আছে।
উপন্যাস: বাঁধনহারা-১৯২৭, কুহেলিকা -১৯৩১, মৃত্যুক্ষুধা -১৯৩০
গল্পগ্রন্থ : রিক্তের বেদন- ১৯২৫
প্রবন্ধ ও নিবন্ধ: যুগবাণী -১৯২২, রুদ্র-মঙ্গল -- ১৯২৬
নাটক : ঝিলিমিলি -১৯৩০
সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার কবি। তিনি হিন্দু-মুসলমান বিভেদকে ঘৃণা করতেন এবং বিশ্বাস করতেন মানুষই সবচেয়ে বড় পরিচয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। সেখানেই তিনি রচনা করেন বহু গান ও কবিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম তার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। উল্লেখযোগ্যগুলো হলো:
জগত্তারিণী স্বর্নপদক-১৯৪৫(কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), পদ্মভূষণ -১৯৬০(ভারত সরকার), বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা -১৯৭২, একুশে পদক (মরণোত্তর)-১৯৭৬ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে তাকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং রাষ্টীয় সম্মান ও নাগরিকত্ব প্রদান করে।
১৯৪২ সালে কবি দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে তিনি ধীরে ধীরে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। প্রায় ৩৪ বছর তিনি নীরব ও অসুস্থ অবস্থায় জীবনযাপন করেন। এই দীর্ঘসময় তিনি সাহিত্যচর্চা থেকে সম্পুর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৭ বছর। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।
বাঙালী জাতি আজও তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।।।।

No comments