শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: জীবন, সাহিত্য ও অমর সৃষ্টি

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে ক'জন কথাশিল্পী সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তার সাহিত্য কেবল গল্প বা উপন্যাস নয়- এগুলো বাঙালি সমাজের দর্পণ, যেখানে প্রেম, বেদনা, সামাজিক বৈষম্য, নারী - পুরুষের সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নিচে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম, শৈশব  এবং বিবাহ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী

অভাব-অনটন, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যেই তাঁর শৈশব কেটেছে। পিতার অস্থির স্বভাব ও আর্থিক দূরাবস্থার কারণে তাদের পরিবারকে বহুবার গ্রাম বদলাতে হয়। এই জীবনসংগ্রামই পরবর্তীকালে তার সাহিত্যে বাস্তবতার গভীরতা এনে দেয়।

বিবাহিত জীবনে তিনি কখনোই সুখী ছিলেন না। তার বিবাহিত জীবন ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর, সল্পস্থায়ী ও ট্রাজেডিতে পরিপূর্ণ। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল শান্তিদেবী। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শান্তিদেবী প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।এই মৃত্যু তাকে মানসিক ভাবে ভীষণ আঘাত করে।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর বহু বছর পর তিনি বিবাহ করেন হিরণ্ময়ী দেবীকে। হিরণ্ময়ী দেবী ছিলেন তার থেকে বয়সে ছোট। এই বিয়েতে পারিবারিক স্থিতি এলেও দাম্পত্য সুখ খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এবং তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। 

শিক্ষা ও কর্মজীবন 

শরৎচন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর এগোইনি। আর্থিক সমস্যার কারনে পড়াশোনা বাদ অসম্পূর্ণ রেখে তাকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়। তিনি কলকাতা, রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) প্রভৃতি স্থানে বিভিন্ন সময়ে চাকরি করেন।

 রেঙ্গুনে তিনি ব্রিটিশ সরকারের Public Works Department (PWD) এর Accounts Office -এ চাকরি করেন। কাজের ধরন ছিল হিসাব রাখা, বিল-ভাউচার প্রস্তুত এবং আর্থিক নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ। এটি ছিল একেবারেই নিম্নপদস্থ কেরানির চাকরি। কিন্তু তিনি প্রায় দীর্ঘ ১৩ বছর এই কাজেই যুক্ত ছিলেন। 

রেঙ্গুনে থাকাকালীন সময়েই তার সাহিত্যচর্চার গভীরতা লাভ করে। একাকীত্ব, প্রবাসজীবন ও সমাজ থেকে দূরে থাকা তার লেখাকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।

সাহিত্যজীবনের সূচনা 

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যজীবন শুরু হয় ছোটগল্প দিয়ে। প্রথম উল্লেখযোগ্য গল্প মন্দির  প্রকাশিত হয় (১৯০৭) খ্রিস্টাব্দে। তবে প্রকৃত খ্যাতি আসে বড়দিদি উপন্যাস প্রকাশের মাধ্যমে (১৯০৭)। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার বিখ্যাত গ্রন্থগুলো :

উপন্যাস 

বড়দিদি (১৯০৭), দেবদাস (১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), পরিণীতা (১৯১৪), শ্রীকান্ত (৪ খন্ড: ১৯১৭—১৯৩৪), পল্লীসমাজ (১৯১৬), বিরাজ বউ (১৯১৪), গৃহদাহ (১৯১৯), দত্তা (১৯১৩), পথের দাবী (১৯২৬), শেষ প্রশ্ন (১৯৩১), দেনা-পাওনা (১৯২৩), নারীর মূল্য (অসম্পূর্ণ), শুভদা (অসম্পূর্ণ উপন্যাস) । 

ছোটগল্প সংকলন 

গল্পগুচ্ছ (১ম—৫ম খন্ড), রামরামা, মহেশ, অভাগীর স্বর্গ, বিলাসী, কাশীনাথ, অরক্ষণীয়া। 

প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা 

নারীর দাবি, সাহিত্য কথা, স্বদেশ ও সাহিত্য।। 

কালজয়ী চরিত্রসমূহ (চরিত্র ও গ্রন্থ একসাথে) 

দেবদাস মুখোপাধ্যায়, পার্বতী(পারু), চন্দ্রমুখী — দেবদাস

শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, ইন্দিরা, অভয়া — শ্রীকান্ত (সম্পুর্ণ অংশ)

ললিতা, শেখর, গিরিন — পরিণীতা 

বিরাজ, সতীশ — বিরাজ বউ

সবিত্রী, সতীশচন্দ্র, কিরণময়ী — চরিত্রহীন 

রামকৃষ্ণ, কমল, নরেশ — পল্লীসমাজ 

রামেশ্বর, লাবণ্য, গিরিশচন্দ্র — দেনা-পাওনা

সব্যসাচী, অভয়া, অমরেশ — পথের দাবী 

মহিম, অচলা, সুরেশ — গৃহদাহ 

বিজয়া, নরেন — দত্তা

এই চরিত্র ও গ্রন্থগুলোর মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র প্রেম, সামাজিক দ্বন্দ্ব, নারী-পুরুষের মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। 

তিনি বিশ্বাস করতেন --

"সাহিত্য মানুষের কথা বলবে, মানুষের দুঃখ-সুখের কথা বলবে।"

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর কিছু বিখ্যাত সংলাপ :

"সংসারে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো— মানুষ হয় বেঁচে থাকা।" 

"ভালোবাসা কাউকে বেঁধে রাখে না, সে মুক্তি দেয়।"

"যাকে সমাজ পতিতা বলে, সে অনেক সময় সমাজের চেয়ে বেশি মানুষ।" 

"নারী দুর্বল নয়— তাকে দুর্বল করে রাখা হয়।"

"মানুষের চরিত্র বিচার করা সহজ, কিন্তু তার পরিস্থিতি বোঝা কঠিন।"

"সব দোষ অপরাধ নয়, আর সব নীরবতা দুর্বলতা নয়।"

"ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়, তবে সেই অপরাধ স্বীকার করি।"

"যে ভালোবাসে, সে হারাতেও জানে।"

"ভালোবাসা কখনো দাবী করে না, সে শুধু দেয়।"

"নারীকে বুঝতে হলে আগে মানুষ হিসেবে বুঝতে শিখতে হয়।"

"সংসার বড় কঠিন জিনিস—এখানে ভালোবাসা টিকাতে গেলে অনেক কিছু হারাতে হয়।"

"যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে হারানোর ভয়ই সবচেয়ে বড় শাস্তি। "


সম্মাননা ও পুরস্কার 


শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবদ্দশায় বিশেষ কোন সরকারি পুরস্কার গ্রহণ করেননি। তবে তিনি ছিলেন:

★ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্নপদক(১৯২৩) প্রাপক।
★ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত ও অনূদিত লেখক।

মৃত্যু 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন গুরুতর রোগে ভুগেছিলেন ( লিভারের রোগ, শ্বাসকষ্ট, হজমের সমস্যা) । দীর্ঘ রোগভোগের পর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ খ্রীস্টাব্দে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তার মৃত্যু বাংলা সাহিত্যজগতে  এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে।


**আরও জানতে

**View Blog








No comments

Powered by Blogger.